Call :01916248686 vascularspecialistcenter@gmail.com

Blog Details

Blog

রক্তনালীর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা ভাসকুলার অ্যানোমালিজ: কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

শরীরের রক্ত সঞ্চালন করা রক্তনালীর কাজ। কিন্তু কখনও কখনও রক্তনালী জন্মগত ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ভাসকুলার অ্যানোমালিজ' (Vascular Anomalies)

ভাসকুলার অ্যানোমালিজ মূলত দুই ব্যাপার; ভাসকুলার টিউমার হচ্ছে শরীরের কোন অংশে অস্বাভাবিক কোষের অতিরিক্ত বৃদ্ধি্র ফলে সৃষ্ট পিণ্ড বা ফোলা এবং ভাসকুলার ম্যালফরমেশন। ম্যালফরমেশন হচ্ছে জন্মগত ত্রুটির কারণে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আর টিউমার। রক্তনালীর টিউমার কয়েক প্রকার হয়—হিম্যানজিওমা, হিমাজিওএন্ডোথেলিওমা, এনজিওসারকোমা, টাফটেড এনজিওমা। এর মধ্যে এনজিওসারকোমা ক্যান্সার জাতীয় টিউমার, বাকিগুলো বেনাইন অথবা কম ক্ষতিকারক টিউমার।

বাচ্চাদের সবচেয়ে কমন টিউমার হচ্ছে 'ইনফেন্টাইল হিম্যানজিওমা'। মূলত ইনফেন্টাইল হিম্যানজিওমা সাদা চামড়ার মানুষদের হয় এবং মেয়েদের সাথে ছেলেদের অনুপাত হচ্ছে ৪:১। আমাদের দেশে, আমাদের রেইসে এটার সংখ্যা অত বেশি নয়। বাচ্চার যদি জন্মগতভাবে ওজন কম থাকে, তাদের এই টিউমারটা বেশী হয়।

৫০ ভাগ ক্ষেত্রে জন্মের সময় কোন কিছুই থাকে না, স্বাভাবিকভাবে বাচ্চারা জন্ম হয়। আর ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে একটা জন্মদাগ নিয়ে জন্ম হয়। ৩ থেকে ৫ মাসের মধ্যে ১০০ ভাগ বাচ্চারই এই টিউমারটা দেখা যায়।

এই টিউমারের তিনটা পর্যায় আছে—প্রথম পর্যায়টাকে বলে 'প্রলিফারেটিভ ফেজ', এখানে অতিরিক্ত বৃদ্ধি হয় টিউমারটা। ১ বছর বয়স পর্যন্ত এই বৃদ্ধি হয়। তারপরে টিউমারটা বাড়া থামে এবং এক পর্যায়ে আস্তে আস্তে এটা নরম হয়ে আসে এবং ছোট হতে থাকে। এভাবে ১২ বছর পর্যন্ত এটা ছোট হয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৫ বছরের মধ্যে ইনফেন্টাইল হিম্যানজিওমা নিজে নিজেই চলে যায়, বাকিগুলো ১২ বছর পর্যন্ত নিজে নিজেই চলে যায়। ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে কিছু কিছু অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে—যেমন চামড়ায় একটু দাগ, কিংবা চামড়াটা ঝুলে থাকা, কিংবা একটা নরম চর্বির টিউমারের মতো থেকে যায়। সেই সমস্ত ক্ষেত্রে ওগুলো অপারেশন করে ফেলে দিতে হয়।

ইনফেন্টাইল হিম্যানজিওমা যদি ছোট হয়, সেগুলোর কোন ধরনের চিকিৎসাই প্রয়োজন হয় না। শুধু বাচ্চার বাবা-মাকে পরামর্শ দিতে হয় এবং এটাকে 'মাস্টারলি অবজার্ভ' করতে হয়। মাস্টারলি অবজার্ভ করা মানে হচ্ছে এটাকে তিন মাস পর পর দেখা, ছবি রাখা, এর আয়তন কতটুকু সেটা নোট করে এর গতিবিধি লক্ষ্য করা।

আর যদি এটা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে—যেমন এটা চোখের কাছাকাছি, শ্বাসনালীর কাছাকাছি, কিংবা কোনো ভাইটাল অর্গানসের কাছাকাছি থাকে—কিংবা এটা যদি অনেক বড় হয়, এবং এটাকে ন্যাচারালি হিল করতে দেওয়া হলে যদি কোনো কদর্য দাগ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা আলসার কিংবা রক্তপাত হয়, এ সমস্ত ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হয়। খুব বিরল ক্ষেত্রে অপারেশনেরও প্রয়োজন হতে পারে।

খুব ছোট টিউমার হলে ড্রপ টিমোলল এক ফোঁটা করে দিনে দুইবার দিতে হয়। অথবা মুখে খাওয়ার ওষুধ প্রোপ্রানোলল (বিটা ব্লকার প্রোপ্রানোলল) দেওয়া হয় এবং মাত্রা বাচ্চার ওজন অনুযায়ী দিতে হয় এবং এটা ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত দিতে হয়।

কনজেনিটাল হিম্যানজিওমা মায়ের গর্ভেই সম্পূর্ণভাবে পরিণত অবস্থায় বাচ্চা জন্ম হয়। জন্মের পরে এটা আর বাড়েই না। এটার তিনটা গতিপথ হয়—এক গ্রুপ খুব তাড়াতাড়ি নিজে নিজেই চলে যায়, আরেকটা গ্রুপ বাড়েও না কমেও না, আরেকটা গ্রুপ আংশিকভাবে কমে। পরের যে দুটো গ্রুপ, যারা বাড়েও না কমেও না এবং যারা আংশিক কমে তাদের বেলায় অপারেশন করতে হয়।

ম্যালফরমেশনগুলো এর রক্তনালীর প্রকারের ওপর নির্ভর করে। ক্যাপিলারি, ভেইন (শিরা), আর্টারি (ধমনী) এবং লিমফেটিকস—এই চার ধরনের রক্তনালী মানুষের শরীরে থাকে। গর্ভকালীন অবস্থায় যখন রক্তনালী তৈরি হয় সেই সময়ে যদি কোনো সমস্যা হয়, সেখান থেকে ম্যালফরমেশনগুলো হয়।

রক্তনালীর তৈরির কোন পর্যায়ে সমস্যা হচ্ছে সেটার ওপর নির্ভর করে কি ধরনের ম্যালফরমেশন হবে। ক্যাপিলারি থেকে যদি হয়, ক্যাপিলারি ম্যালফরমেশন বলা হয়। ধমনীর থেকে যেটা হয়, সেটাকে বলে আর্টেরিয়াল ম্যালফরমেশন। ভেইন (শিরা) থেকে হলে ভেনাস ম্যালফরমেশন। লিমফেটিকস থেকে হলে লিমফেটিক ম্যালফরমেশন।

বলা হয় কতগুলো আছে কম্বাইন একাধিক নালীর একসাথে ম্যালফরমেশন । যেমন আর্টারিও-ভেনাস ম্যালফরমেশন, লিম্ফোভেনাস ম্যালফরমেশন। এবং কিছু সিনড্রোম থাকে। এর মধ্যে খুব কমন হচ্ছে KT সিনড্রোম। KT সিনড্রোমে (ভেনাস ম্যালফরমেশন, লিমফেটিক ম্যালফরমেশন, ক্যাপিলারি ম্যালফরমেশন এবং মাংস এবং হাড়ের বৃদ্ধি সবকিছু একসাথে থাকে)। এর চিকিৎসা খুব জটিল।

ক্যাপিলারি ম্যালফরমেশন পালস ডাই লেজার দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ভেনাস ম্যালফরমেশন যদি লোকালাইজড থাকে সেসব ক্ষেত্রে অপারেশন প্রথম চয়েস। কিংবা খুব বেশি বড় হলেও অপারেশন করতে হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে বা বিস্তৃতভাবে থাকলে তখন স্ক্লেরোথেরাপি বা ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। প্রয়োজনে পরবর্তীতে অপারেশন করা হয়।

অপারেশন এবং স্ক্লেরোথেরাপি দুইটা একসাথেও করা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু স্ক্লেরোথেরাপি দিতে হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুই করা যায় না। তখন আমরা এক ধরনের কম্প্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করতে বলি।

আর্টারিও-ভেনাস ম্যালফরমেশনে কিছু রক্তনালী থেকে কিছু শাখা আর্টারি এবং ভেইনকে কানেক্ট করে। এনজিওগ্রাম করে গ্লু কিংবা কয়েল দিয়ে সেই অস্বাভাবিক কানেকশনটা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে অপারেশন করা হয়।

অপারেশনে যেন রক্তপাত কম হয় সেজন্য এম্বোলাইজেশন করা হয়। এম্বোলাইজেশন ছাড়াও সরাসরি অপারেশন করা যেতে পারে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু স্ক্লেরোথেরাপি ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে। কখনো কখনো এমপুটেশনের মানে পা কিংবা হাতের একটা অংশ কেটে ফেলারও প্রয়োজন হয়।

ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন কোন ক্যান্সার নয়। কিন্তু এর একটাই সমস্যা, এটা নির্মূল করা খুব কঠিন। এমনকি এটা অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারের চেয়েও খারাপ আচরণ করে। কারণ ক্যান্সার যদি আমরা নির্মূল করে পুরো মূলসহ ফেলে দিতে পারি, ভালো হয়ে যায়। কিন্তু ম্যালফরমেশন মূলসহ ফেলা খুবই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেই কারণে এটা বারবার হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্তনালীর অস্বাভাবিক বৃদ্ধির চিকিৎসা প্রদান করা হয়:

স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy): ইনজেকশনের মাধ্যমে ম্যালফরমেশন নিয়ন্ত্রণ।
এম্বোলাইজেশন (Embolization): রক্তনালীর অস্বাভাবিক সংযোগ বন্ধ করা।
লেজার থেরাপি: দাগ বা টিউমার নিরাময়ে কার্যকরী।
অপারেশন: জটিল ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ সার্জনদের দ্বারা সফল অস্ত্রোপচার।

আপনার শিশু বা পরিবারের কারও শরীরে জন্মগত কোনো দাগ, ফোলা বা রক্তনালীর অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দেরি করবেন না। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ভাসকুলার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসায় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

Our Latest Blogs

ভেরিকোস ভেইন কী? কারণ, লক্ষণ, নির্ণয় ও চিকিৎসা

ভেরিকোস ভেইন হলো পায়ের শিরা ফুলে যাওয়া, আঁকাবাঁকা হওয়া ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার একটি সাধারণ রক্তনালীর রোগ। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে ব্যথা, ফোলা, ত্বকের পরিবর্তন ও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

নীরব ঘাতক ডিভিটি (DVT): পায়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি এবং জীবন বাঁচানোর উপায়

ডিভিটি (DVT) হলো শরীরের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার একটি গুরুতর সমস্যা, যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী Pulmonary Embolism-এর কারণ হতে পারে। পা ফোলা, ব্যথা, গরম বা লাল হয়ে যাওয়া— এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ভাস্কুলার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

পা কাটার প্রধান কারণ: ক্রনিক লিম্ব ইস্কেমিয়া (CLI) - লক্ষণ, ঝুঁকি ও জীবন বাঁচানোর উপায়

ক্রনিক লিম্ব ইস্কেমিয়া (CLI) হলো হাত বা পায়ের রক্তনালী ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার গুরুতর সমস্যা, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে পায়ে ঘা, গ্যাংরিন এমনকি অঙ্গহানির কারণ হতে পারে। হাঁটলে পায়ে ব্যথা, পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা ঘা না শুকালে দ্রুত ভাস্কুলার সার্জনের পরামর্শ নিন।

শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক নীরব ঘাতক: অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম ও আপনার করণীয়

অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম হলো শরীরের প্রধান রক্তনালী অ্যাওর্টা বেলুনের মতো ফুলে যাওয়ার একটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সমস্যা। সময়মতো শনাক্ত না হলে রক্তনালী ফেটে গিয়ে মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বয়স ৬০-এর বেশি, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে দ্রুত ভাস্কুলার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

রক্তনালীর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা ভাসকুলার অ্যানোমালিজ: কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

ভাসকুলার অ্যানোমালিজ হলো রক্তনালীর জন্মগত বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যা শিশুদের জন্মদাগ, ফোলা, হিম্যানজিওমা বা ম্যালফরমেশন হিসেবে দেখা দিতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও ভাস্কুলার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে জটিলতা, রক্তপাত, আলসার বা স্থায়ী দাগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।