Call :01916248686 vascularspecialistcenter@gmail.com

Blog Details

Blog

ভেরিকোস ভেইন: কারণ, উপসর্গ, জটিলতা ও চিকিৎসা

ভেরিকোস ভেইন কী?

ভেরিকোস ভেইন হল রক্তনালীর একটি সাধারণ রোগ। ত্বকের নিচে থাকা কোন শিরাগুলি (ব্যাস প্রায় ৩ মিলিমিটার বা তার বেশি) অস্বাভাবিকভাবে বড়, আঁকাবাঁকা ও ফোলাভাবযুক্ত হয়ে গেলে তাকে ভেরিকোস ভেইন বলা হয়। সাধারণত পায়ের শিরাগুলোতেই বেশি দেখা যায়, তবে শরীরের অন্য অংশেও হতে পারে।

প্রথম দিকে শুধু সৌন্দর্য নষ্ট হওয়াই প্রধান সমস্যা মনে হলেও, চিকিৎসা না নিলে পরবর্তীতে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে – যেমন পায়ে ব্যথা, ভারী ভাব, চুলকানি, ত্বকে কালচে দাগ, এমনকি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা আলসারও হতে পারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০–১৫% মানুষের কোনো না কোনোভাবে ভেরিকোস ভেইন থাকে।

পায়ের ভেরিকোস ভেইন

ক্রনিক ভেনাস ডিজিজ এর কারণ

মাঝারি ও বড় শিরার ভিতরে ছোট ছোট ভাল্ব থাকে, যেগুলো রক্তকে একমুখী ভাবে ওপরের দিকে (হৃদয়ের দিকে) যেতে সাহায্য করে। কোন কারণে এই ভাল্বগুলো দুর্বল বা নষ্ট হয়ে গেলে রক্ত উল্টো দিকে নেমে আসে, শিরার ভিতরে চাপ বেড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শিরা প্রসারিত ও আঁকাবাঁকা হয়ে ওঠে – এটিই ক্রনিক ভেনাস ডিজিজ ও ভেরিকোস ভেইনের মূল কারণ।

ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু কারণ হল:

  • পারিবারিকভাবে ভেরিকোস ভেইনের ইতিহাস থাকা
  • দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করার অভ্যাস (শিক্ষক, গৃহিনী, সার্ভিস হোল্ডার ইত্যাদি)
  • স্থূলতা ও ওজন বেশি হওয়া
  • আগে পায়ে DVT বা গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস
  • একাধিক গর্ভধারণ, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে
  • বয়স বাড়ার সাথে শিরার প্রাকৃতিক দুর্বলতা
  • আগের কোনো অস্ত্রোপচারের কারণে শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
শিরার ভাল্ব নষ্ট হয়ে ভেরিকোস ভেইন

ক্রনিক ভেনাস ডিজিজ এর লক্ষণ

  • দুপুরের পর বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পায়ে ভারীভাব ও অস্বস্তি অনুভব
  • পায়ের পেশীতে টান, ক্র্যাম্প, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
  • পায়ের গোঁড়ালি বা গোড়ালির আশেপাশে হালকা ফোলা
  • ত্বকের নিচে নীল বা বেগুনি রঙের আঁকাবাঁকা শিরা স্পষ্ট দেখা যাওয়া
  • ত্বক কালচে হওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া বা একজিমার মত ঘা হওয়া
  • দীর্ঘদিন থাকলে গোড়ালি বা পায়ের নীচের অংশে নন–হিলিং আলসার বা ক্ষত তৈরি হওয়া
ভেরিকোস ভেইন ও আলসারের বিভিন্ন ধাপ

ভেরিকোস ভেইন নির্ণয়

ভেরিকোস ভেইন সন্দেহ হলে একজন অভিজ্ঞ ভাসকুলার সার্জনের সাথে পরামর্শ করা জরুরি। প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করা হয় – দাঁড়ানো ও বসা অবস্থায় শিরাগুলোর অবস্থা, ত্বকের রঙ, ফোলা, আলসার ইত্যাদি দেখা হয়।

এর পাশাপাশি কিছু বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডুপ্লেক্স ভেনাস আল্ট্রাসাউন্ড। এই পরীক্ষার মাধ্যমে:

  • শিরার ভিতরে রক্ত প্রবাহের দিক ও গতি
  • কোথায় ভাল্ব নষ্ট হয়েছে এবং কতটা রিফ্লাক্স হচ্ছে
  • গভীর শিরায় কোনো ব্লক বা রক্ত জমাট (DVT) আছে কি না

এসব তথ্য চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডুপ্লেক্স ভেনাস স্ক্যান মেশিন

ভেরিকোস ভেইন বা আঁকাবাঁকা শিরার সমস্যায় কখন অপারেশন প্রয়োজন?

সব ভেরিকোস ভেইনের ক্ষেত্রে অপারেশন দরকার হয় না। নিচের যেকোনো অবস্থায় অপারেশনের কথা ভাবা হয়:

  • পায়ে নিয়মিত ব্যথা, ভারী ভাব বা হাঁটতে অসুবিধা
  • দীর্ঘস্থায়ী ফোলা বা ত্বক কালচে হয়ে যাওয়া
  • পায়ে বার বার রক্ত জমাট বাঁধা বা DVT এর ইতিহাস
  • ভেরিকোস ভেইন ফেটে রক্তক্ষরণ হওয়া
  • দীর্ঘদিনের নন–হিলিং ভেনাস আলসার
  • সৌন্দর্যগত সমস্যার কারণে রোগীর দুশ্চিন্তা বা মানসিক অস্বস্তি

ভেরিকোস ভেইন চিকিৎসা

প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই লাইফস্টাইল পরিবর্তন ও কনজারভেটিভ চিকিৎসায় উপসর্গ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যেগুলো করা হয়:

  • দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা একটানা বসে না থেকে মাঝেমাঝে হাঁটা–চলা করা
  • ওজন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা
  • বসে বা শুয়ে থাকাকালে সম্ভব হলে পা হৃদপিণ্ডের চেয়ে উপরে তুলে রাখা
  • কামপ্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সাইজ ও প্রেসার)
  • কিছু ক্ষেত্রে ভেন–টোনিং ওষুধ বা ব্যথানাশক ব্যবহার
কমপ্রেশন স্টকিংস

ভেরিকোস ভেইন অপারেশন

যখন কনজারভেটিভ চিকিৎসায় উপকার না হয় অথবা জটিলতা দেখা দেয়, তখন অপারেটিভ চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে ভেরিকোস ভেইন অপারেশনের প্রধানত দু’টি ধরন প্রচলিত:

১. কাটা–ছেঁড়া মাধ্যমে (ওপেন সার্জারি)

  • স্ট্রিপিং (Stripping)
  • ফ্লেবেকটমি (Phlebectomy)
  • লিন্টন’স অপারেশন (Linton’s)
ওপেন ভেরিকোস ভেইন অপারেশন

২. কাটা–ছেঁড়া বিহীন (এন্ডোভাসকুলার / মিনিমালি ইনভেসিভ)

  • রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাব্লেশন (RFA)
  • এন্ডোভেনাস লেজার অ্যাব্লেশন (EVLA)
  • মেকানিক্যাল কেমিক্যাল অ্যাব্লেশন (MCA)
  • ভেইন গ্লু (Glue treatment)
  • স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy)

এসব আধুনিক পদ্ধতিতে সাধারণত খুব ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যাথেটার ঢুকিয়ে শিরাকে ভিতর থেকে বন্ধ করা হয়। ফলে কাটা–ছেঁড়া কম, ব্যথা কম এবং রোগী খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

RFA, EVLA ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতি

শেষ কথা

বেশিরভাগ ভেরিকোস ভেইন দীর্ঘদিন থাকলেও ক্যান্সার বা প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হয় না, তবে উপসর্গ বাড়লে বা ত্বক/শিরায় জটিলতা দেখা দিলে দেরি না করে ভাসকুলার সার্জনের পরামর্শ নেওয়া খুবই জরুরি। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে ব্যথা–অস্বস্তি কমে গিয়ে জীবনযাত্রার মান অনেক ভালো রাখা সম্ভব।

আপনার যদি ভেরিকোস ভেইন বা আঁকাবাঁকা শিরার সমস্যা থাকে, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন – প্রয়োজনে ডুপ্লেক্স স্ক্যান এবং অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে আপনাকে জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করা হবে।

Our Latest Blogs

ভেরিকোস ভেইন: কারণ, উপসর্গ, জটিলতা ও চিকিৎসা

ভেরিকোস ভেইন হলো রক্তনালীর ভাল্ব নষ্ট হয়ে রক্ত নিচে জমে থাকা এবং নালীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার একটি অবস্থা। এটি পায়ের রক্তনালীতে বেশি দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে ব্যথা, ফোলাভাব, রঙ্গিন দাগ, ক্র্যাম্প এবং ক্ষতের মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকা, স্থূলতা, গর্ভধারণ, বয়স বা বংশগত কারণেও এ সমস্যা হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না নিলে DVT, Chronic Venous Insufficiency বা Varicose Ulcer হতে পারে।